Published On: Wed, Aug 26th, 2015

মেছতা নিরাময়ে হারবাল চিকিৎসা

মেছতা নিরাময়ে হারবাল চিকিৎসা
হেলথ ডেস্ক : সূর্যরশ্মির প্রভাবে ত্বকে হাইপারমেলানোসিস হয়, অর্থাৎ অতিরিক্ত মেলানিন উৎপন্ন হয়। এতে ত্বকের কিছু কিছু জায়গায় গাঢ় কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়, যা মেছতা বা মেলাজমা (শপলথঢ়শথ) নামে পরিচিত। গ্রিক শব্দ মেলাজ (শপলথঢ়) থেকে মেলাজমা শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ কালো। যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে তবে মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হয়. বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা এবং যারা জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ গ্রহণ করেন বা হরমোন থেরাপি নেন। ত্বকের যেসব জায়গায় সূর্যরশ্মি বেশি পড়ে সেসব জায়গা যেমন- ওপরের গাল, নাক, ঠোঁট ও কপালে মেছতা দেখা যায় (সাধারণত ৩০-৪০ বছর বয়সের মধ্যে হয়)। তবে মাঝে মধ্যে ঘাড়ের পাশে, কাঁধ ও ওপরের বাহুতে দেখা যায়।
গ্রীষ্মপ্রধান ও সাবট্রপিক্যাল দেশগুলোতে যেখানে সূর্যরশ্মি প্রখর সেখানে মেছতার আধিক্য দেখা যায়। মেছতাকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা
এপিডার্মাল : ত্বকের বহি:স্তরের উপরিভাগে এ ধরনের মেছতা দেখা যায়। এ ধরনের মেছতার রঙ গাঢ় বাদামি বর্ণের এবং লাইটের নিচে দেখলে আরো গাঢ় মনে হয়। শতকরা ৭০-৭৫ ভাগ রোগী এই শ্রেণীর এবং চিকিৎসার মাধ্যমে এই মেছতা সারিয়ে তোলা সম্ভব।
ডার্মাল : ত্বকের বহি:স্তরের নিচের স্তরে এই প্রকার মেছতা দেখা যায়। দাগ হালকা বাদামি বর্ণের এবং লাইটের নিচে দেখালে কোনো পরিবর্তন হয় না। শতকরা ১৩ ভাগ রোগী এই পর্যায়ের এবং এদের চিকিৎসায় খুব কমই সাফল্য আসে।
মিশ্রিত : এই ধরনের মেছতা ত্বকের অন্ত:স্তর এবং বহি:স্তরজুড়ে বিদ্যমান থাকে। দাগ হালকা ও বাদামি উভয় রঙেরই হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসায় আংশিক সাফল্য আসতে পারে।
মেছতার কারণ : অনেক ক্ষেত্রেই মেছতার সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তবে হরমোনের ব্যাপার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। নিুে মেছতার প্রধান কারণগুলো উল্লেখ করা হলো।
? মহিলাদের সেক্স হরমোন এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন মেলানোসাইট বা রঞ্জক উৎপাদক কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে বেশি পরিমাণে মেলানিন উৎপাদন করার জন্য। এই বেশি পরিমাণে মেলানিন ত্বকে মেছতার সৃষ্টি করে।
? মেছতার আরেকটি কারণ হলো সূর্যরশ্মি। সূর্যরশ্মির আল্ট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন (অতি বেগুনি রশ্মি) কোষ প্রাচীরে লিপিড আর অক্সিডেশন ঘটায়, ফলে ফ্রি রেডিক্যাল জমা হয় যা মেলানোসাইটকে উদ্দীপিত করে বেশি পরিমাণে মেলানিন তৈরির জন্য। এ জন্য যারা দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকেন বা সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকেন, তাদের মেছতা হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। দীর্ঘ ওয়েভলেংথও মেলানোসাইটকে উদ্দীপিত করে বেশি মেলানিন তৈরির জন্য।
গর্ভাবস্থায় দেহে হরমোন পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় মেছতা দেখা যায়। সন্তান প্রসবের পর ধীরে ধীরে এই দাগ চলে যায়। ? ইস্ট্রোজেন বা প্রোজেস্টেরন হরমোন থেরাপি বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল গ্রহণ করার কারণেও মেছতা হতে পারে।
ওভারিয়ান অথবা থাইরয়েড সমস্যায় ব্যবহৃত ওষুধের কারণেও মেছতা হতে পারে। ? সুগন্ধি সাবান, টয়লেট্রিজ ও কসমেটিকস্ ব্যবহারের কারণেও অনেক সময় মেছতা হয়ে থাকে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল যদিও মেছতার অন্যতম কারণ তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেলেই মেছতা হবে, এমন কথা নেই। আবার জীবনে এক দিনও এই পিল খাননি অথচ তাদের মুখেও মেছতার দাগ হতে দেখা গেছে। তবে এ কথা সত্যি মেছতার দাগ আছে এমন কেউ যদি চিকিৎসা করাচ্ছেন অথচ জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া বন্ধ করেননি সে ক্ষেত্রে এর থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।
রোগ নির্ণয় (উমথবষসঢ়মঢ়) : সাধারণত খালি চোখে দেখেই মেছতা নির্ণয় করা যায়। তবে উডস্ ল্যাম্পের (ডসসন’ঢ় লথশহ, ৩৪০-৪০০ ষশ াথংপলপষবয়ভ) সাহায্যে পরীক্ষা করে বোঝা যায় ত্বকের ডার্মিস এবং এপিডার্মিস স্তরে মেলানিনের পরিমাণ।
আধুনিক চিকিৎসা : মেছতার দাগ দূর করতে সব চর্মরোগ বিশেষজ্ঞই হাইড্রোকুইনোনকে (২-৪%) আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করেন। এই কেমিক্যাল টাইরোসিনেজ এইজাইমকে বাধা দেয়, কারণ এই এনজাইম মেলানিন উৎপাদনের সাথে জড়িত।
চিকিৎসা চলাকালে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে তাহলে দ্রুত ও ভালো ফল পাওয়া যাবে।
সূর্যের আলোতে বেরোনো বন্ধ করতে হবে। যদি বেরোতে হয় তবে অবশ্যই ত্বকে সান ব্লক ক্রিম বা সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করতে হবে বেরোনোর আধা ঘন্টা আগে। এ ছাড়া ছাতা বা স্কার্ফ এবং সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল গ্রহণ এবং হরমোন থেরাপি বন্ধ করতে হবে।
মেছতার কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। চিকিৎসার মাধ্যমে সাময়িকভাবে দাগ চলে যায় কিন্তু সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে আবার দাগ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে কিছু হারবাল পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। নিুেল্প কিছু প্রাকৃতিক বা হারবাল পদ্ধতি দেয়া হলো।
ভিনেগার : ভিনেগার ও সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে ব্যবহার করলে মেছতায় উপকার পাওয়া যায়। এই উপাদান ত্বক পরিষ্কার করে, উজ্জ্বলতা বাড়ায়, ময়েশ্চার ও টোনার হিসেবে কাজ করে। ভিনেগার রাসায়নিকভাবে অ্যাসিটিক অ্যাসিড এবং এর ফর্সা ও উজ্জ্বলতা বাড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়াও এই মিশ্রণ ত্বক মসৃণ ও নরম করে।
পেঁয়াজের রস : পেঁয়াজের রসের সাথে সমপরিমাণ অর্গানিক ভিনেগার মিশিয়ে তুলার সাহায্যে আক্রান্ত স্থানে দিনে দু’বার লাগালে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো ফল পাওয়া যায়। পেঁয়াজের রস না করতে পারলে পেঁয়াজ হ্মাইস করে কেটে ভিনেগারে ডুবিয়ে সেই হ্মাইস আক্রান্ত স্থানে লাগালেও উপকার পাওয়া যাবে।
লেবুর রস : লেবুর রসে আছে এসকরবিক অ্যাসিড যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান সমৃদ্ধ। এই উপাদান ত্বকে অতি বেগুনি রশ্মি  শোষিত হওয়া প্রতিরোধ করে। লেবুর রস সরাসরি ত্বকে লাগানো যায় অথবা হ্মাইস করে কেটে তুলার প্যাডের সাহায্যে দাগের স্থানে সারা রাত লাগিয়ে রেখে সকালে ধুয়ে ফেলতে হবে।
ঘৃতকুমারী : মেছতা দূর করার আরেকটি উপাদান হলো এলোভেরা বা ঘৃতকুমারী পাতার জেল। এই জেলের রয়েছে ত্বকের যাবতীয় সমস্যা দূর করার ক্ষমতা। আক্রান্ত স্থানে আঙুলের ডগার সাহায্যে ধীরে ধীরে জেল ঘষে লাগাতে হবে এবং সারা রাত লাগিয়ে রাখতে হবে। এভাবে কয়েক সপ্তাহ লাগালে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া এলোভেরা জেলের সাথে ভিটামিন ই এবং প্রিমরোজ ওয়েল মিশ্রিত করে লাগালে এক সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাবে। একই সাথে জেলের শরবত খেলে ভালো হবে।
হলুদ : হলুদে থাকে কুরকুমিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা অক্সিডেটিভ ক্ষত মেরামত করতে সাহায্য করে এবং দাগ দূর করে। হলুদের পেস্ট পাঁচ টেবিল চামচ, দুধ ১০ টেবিল চামচ এবং ছোলার ডালের বেসন এক টেবিল চামচ মিশিয়ে পেস্ট করে দাগের ওপর পুরু করে লাগিয়ে রাখতে হবে ৩০ মিনিট। তারপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পরিষ্কার করে ধুয়ে ফেলতে হবে।
মেছতা দূর করতে হলুদের মিশ্রণ বেশ কার্যকর। হলুদের পেস্টের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে পরে পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
পেঁপে : পেঁপেতে বিদ্যমান প্যাপাইন নামক এনজাইম ত্বকের ওপরের মরা কোষ এবং রুক্ষতা দূর করে ত্বককে মসৃণ করে। পেঁপে পেস্ট করে আক্রান্ত স্থানে ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। পেঁপের পেস্ট ত্বকের রঙ উজ্জ্বল করে।
আঙুর বীজের নির্যাস : কিছু মেছতা আছে যা ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। আঙুর বীজের নির্যাসে আছে অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান, যা এ ধরনের মেছতার ক্ষেত্রে কার্যকর। সাধারণত আঙুরের নির্যাস লিকুইড, পিল বা ক্যাপসুল আকারে পাওয়া যায়। তবে গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারী মায়েদের বেলায় এই নির্যাস প্রযোজ্য নয়।
যষ্টিমধুর নির্যাস : যষ্টিমধুর নির্যাস প্রাকৃতিক উপাদান যাতে আছে ত্বক ফর্সা করার উপাদান লিকুইরিটিন ও গ্ল্যাবরিডিন। গ্ল্যাবরিডিন তেলে দ্রবণীয় এবং ত্বকে লাগানো যায় আদর্শ রঙ পরিবর্তনকারী হিসেবে।

Share Button

About the Author

-