বৈষম্যের শিকার হয়েও শত বাঁধা পেড়িয়ে এগিয়ে মেয়েরাই

মাহফুজা খাতুন শিলা, মাবিয়া আক্তার সীমান্ত

আমাদের দেশে নারী পুরুষের ভেদাভেদ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে বিরাজমান আছে  ক্রিড়া জগত পর্যন্ত। অবহেলা ও অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের হাজারো নারী প্রতিভা।বাংলাদশের ক্রীড়াঙ্গনে বরাবরই বৈষম্যের শিকার নারী খেলোয়াড়রা। শুধু পরিবার কিংবা সামাজিকভাবে নয়, তাদের এই বৈষম্য চলতে থাকে নিজ নিজ ফেডারেশন পর্যন্ত। ফেডারেশনের বৈষম্যের শিকার হয়ে স্বর্ণকন্যা মাহফুজা খাতুন শিলা সাঁতার ছেড়ে দেয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে ভারোত্তোলনের মতো কঠিন খেলা ছেড়ে অন্য কোনো ডিসিপ্লিন বেছে  নেয়ার কথা ভেবেছিলেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। সেটা হয়তো তারা করেননি। করেননি বলেই গৌহাটিতে জাতীয় সংগীত বেজেছে। উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা। মেয়েদের চেয়ে বেশি সংখ্যায় এসে, বেশি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়ে তাদের সমান কিছু করতে পারেনি বাংলাদেশের ছেলে অ্যাথলেটরা।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফলাফল এসেছে গত ঢাকা এসএ গেমসে। ওই আসরে ২৩ ডিসিপ্লিনের মধ্যে মাত্র ১২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেয়ার সুযোগ ঘটেছিল নারী অ্যাথলেটদের। সাইক্লিং ছাড়া মেয়েদের অংশ নেয়া সব ডিসিপ্লিনে পদক এসেছে। ২৩ স্বর্ণের মধ্যে ৮টি জিতেছিলেন বৈষম্যের শিকার হওয়া মেয়েরা। সাতটা সিলভার ১৮টা ব্রোঞ্জ এসেছে তাদের হাত ধরে। এবার শিলং-গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসের দ্বাদশ আসরে মেয়েদের অংশ নেয়া ডিসিপ্লিনের সংখ্যা বাড়লেও কমেছে অ্যাথলেট সংখ্যা। চলতি আসরে বাংলাদেশের অংশ নেয়া ৩৭০ অ্যাথলেটের মধ্যে ২২৩ পুরুষের বিপরীতে নারীদের সংখ্যা  ১৪৭। সংখ্যায় নারীরা পিছিয়ে থাকলেও এবারও সফল তারা। গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পাওয়া চারটি গোল্ডসহ ৪২টি পদকের মধ্যে ২৩টি জিতেছে নারীরা, যার মধ্যে চার স্বর্ণের তিনটি জিতেছেন শিলা ও মাবিয়া। দশ রৌপ্যের মধ্যে কেবল খো-খো পুরুষ ছাড়া বাকি নয়টিতেই মেয়েদের অবদান আছে। অথচ  ভারোত্তোলনের মতো সফল খেলায় নারী অ্যাথলেট পাঠাতেই চায়নি বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন (বিওএ)। ভোগেশ্বরী ফুকননী ইনডোর স্টেডিয়ামে ৪৮ কেজি ওজন শ্রেণিতে ব্রোঞ্জ জিতে পদকের খাতা খোলেন নারী ভারোত্তোলক মোল্লা সাবিরা সুলতানা। পরদিন ভারোত্তোলন থেকে দেশকে প্রথম স্বর্ণ এনে দেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। স্বর্ণজয়ী এই সীমান্তকে নিয়ে কত কথাই বলেছিল অলিম্পিকের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি ছিল সীমান্তের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যত সফলতা, তার সবকটুকুই এসেছে নামকা ওয়াস্তের সব প্রতিযোগিতা থেকে। সাঁতারের শিলার বেলায় ঘটেছে প্রায় একই রকম ঘটনা। বিদেশী ট্রেনিং থেকে শুরু করে ফেডারেশনের সকল সুযোগ সুবিধায় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এই জলকন্যা। এতে সাঁতারই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন শিলা। তবে দু’টি স্বর্ণ জিতে আপাতত এই ভাবনা নেই তার। সফলতা এসেছে বলে মাঝখানের বাধাগুলো বড় হয়ে উঠছে না তার জন্য। তবে ভাগ্যের চাকা তো পিছলেও যেতে পারত। ফেডারেশনের অবহেলায় বুকে ক্ষোভ জমে জমে সাঁতার ছেড়ে দেবেন, এসএ গেমসের ক্যাম্পে যোগ দেবেন না, মাথার মধ্যে এসবই শুধু ঘুরছিল। তখনই শুনলেন পার্ক তেগুনের আবার ঢাকায় আসার খবর। মাহফুজা দূরে থাকতে পারলেন না। জানতাম, ‘পার্কের কাছে কোনো বৈষম্য নেই। গুণের কদর করলে উনিই করবেন। আর এত ভালো মানের কোচও আমি আমার এই সাঁতার জীবনে পাইনি। তিন মাস উনাকে পেলাম। নিজের সবটা ঢেলে দিয়ে ক্যাম্প করেছি। পার্কও একটা কথাই বলেছেন, তোমাকে দিয়ে হবে।’ সব ডিসিপ্লিনেতো পার্ক নেই যে গুণের কদর বুঝবেন। এসব কারণেই দিন দিন বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে মেয়েদের সংখ্যা কমছে। দেশি কোচরাও মেয়েদের বিতাড়িত করার অন্যতম কারণ। শিলাদের মতো অ্যাথলেটরা নানা সময় নানা বৈষমের শিকার হচ্ছেন দেশি এসব কোচের দ্বারা। ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, কাবাডিতেও কোচদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন খেলোয়াড়রা। তবে এসএ গেমসে এবারের সফলতা সেই বৈষম্য কিছুটা হলেও কমাবে বলে মনে করছেন ভারোত্তোলনের কোচ শাহরিয়া সুলতানা সূচি। তিনি মনে করেন, গেমসে এবার নারীদের সফলতা অলিম্পিকের চোখ খুলে যাবে। আমার বিশ্বাস সামনের দিনগুলোতে আরও বেশিসংখ্যক নারী নিয়ে সারা বছর অনুশীলনের সুযোগ পাবো আমরা। শুধু নারী বাড়ালেই চলবে না, বাড়াতে হবে নারীদের কোচ ম্যানেজারের সংখ্যা এমনটাই দাবি সাবেক মহিলা অ্যাথলেট শামীমা সাত্তার মিমুর।

ডেইলি খবর/ ১১ ফেব্রয়ারি/ ২০১৬

Share Button

About the Author

-